ঢাকা   শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মানবতাবিরোধী অপরাধে ৭ আওয়ামী লীগারের মৃত্যুদণ্ড

Daily Inqilab ইনকিলাব

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৭ এএম | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম

চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যায় উস্কানির দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ সাত জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় তিন সদস্য বিশিষ্ট্য ট্রাইব্যুনালের জনাকীর্ণ কক্ষে সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় ঘোষিত পুনগর্ঠিত এই ট্রাইব্যুনালের এটি দ্বিতীয় রায়। এর আগে গত বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি এই ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীয় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আব্দুল্লা আল মামুনকে সাজা দেয়া হয়। হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃদ্যুদণ্ড দেয়া হলেও রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে আদালত। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ মঙ্গলবারের সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রদত্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম রায়ের মধ্য দিয়ে জুলাই গণহত্যা মামলার বিচার নিয়ে সংশয় কেটে গেলেও নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে ট্রাইব্যুনালের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা যে শঙ্কা ছিল, ১৫ সেপ্টেম্বরের রায়ের মধ্য দিয়ে সে আশঙ্কা অনেকটাই দূরিভূত হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর এই রায়ে যাদেরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, এরা প্রত্যেকেই শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে নিজেদেরকে আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে মনে করতেন। রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, কেউই আইন বা বিচারের ঊর্ধ্বে নন।

প্রতিপক্ষ বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের শায়েস্তা করতেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সেই মতলবি ট্রাইব্যুনালের বিচারের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও সেই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমেই শেখ হাসিনা জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লাহ, মীর কাসেম আলী, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সরিয়ে দিয়ে নিজের ফ্যাসিবাদী শাসন নিরঙ্কুশ করতে চেয়েছিলেন। যদিও সেই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া, সাক্ষ্য গ্রহণ, এবং বিচারকদের নিরপেক্ষতা নিয়ে শুরু থেকেই নানা বির্তক ছিল। দেশে-বিদেশে সেই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও শেখ হাসিনা কোনোকিছুকেই পাত্তা না দিয়ে যেনতেন প্রকারে বিচার করে বিরোধীদলের নেতাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। এমনকি এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের স্কাইপে কথপোকথনের রেকর্ড ফাঁস হয়ে গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিচারের প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পরও বিচার কিংবা মৃত্যুদণ্ডের রায় বাস্তবায়ন বন্ধ হয়নি। সেই বিচার প্রক্রিয়া ছিল ভারতীয় হেজিমনিক এজেন্ডার অংশ। ইসলামি বক্তা আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গন থেকে তুলে নিয়ে ভারতে আটক করে রাখার ঘটনার মধ্য দিয়ে অনেক কিছুই প্রকাশিত হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল শেখ হাসিনার দেড় দশকের দুঃশাসন, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধী গণবিস্ফোরণ। ছাত্রদের প্রতিবাদ ঠেকাতে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সরকারের দলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও সশস্ত্র অবস্থায় রাজপথে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের হাতে চৌদ্দশ’র বেশি মানুষ শহীদ এবং প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব ও আহত হয়ে এখন মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। একাত্তরে মীমাংসিত ইস্যুকে পুনরুজ্জীবিত করে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ও বিচার প্রক্রিয়ায় শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দেশে যে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, জুলাইয়ের গণহত্যার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের সেই ট্রাইব্যুনালের হাতে নিজেদের বিচারের রাজদণ্ড তুলে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনাল ইতিহাসের কোনো ঝাপসা স্মৃতি বা অপরাজনৈতিক ন্যারেটিভের বিচার করছে না, তারা একটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে গণহত্যার জ্বলন্ত, দগদগে ক্ষতচিহ্নকে বিচারের প্রলেপে প্রশমনের চেষ্টা করছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের মানুষ সর্বাগ্রে জুলাই গণহত্যার বিচার ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই সনদ ও জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ৭ মাসের মাথায় ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনার পর আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ওবায়দুল কাদেরের রায় দেখে দেশের মানুষ অনেকটাই আশ্বস্ত ও আশাবাদী। মানুষ বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিস্টের উত্থান দেখতে চায় না। এর যে কোনো আশঙ্কা চিরতরে বন্ধ করা জনগণের সরকার এবং বিরোধীদলের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণ, ব্যবসায়ী ও আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কদের মাধ্যমে দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার করে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া ও আদালতের মাধ্যমে এসবেরও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে যে কোনো ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যার সাথে যারা জড়িত তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে পলাতক অপরাধীরা এখনো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।


বিভাগ : সম্পাদকীয়


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

আরও পড়ুন

ইনকিলাবের সাংবাদিক হাফিজুর রহমান মিন্টুর ইন্তেকাল

ইনকিলাবের সাংবাদিক হাফিজুর রহমান মিন্টুর ইন্তেকাল

ফরিদপুরে ‘শ্রমিক কল্যাণ’এর নামে সড়কে চাঁদাবাজি

ফরিদপুরে ‘শ্রমিক কল্যাণ’এর নামে সড়কে চাঁদাবাজি

আত্রাই বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় মাছ ফিরিয়ে আনতে ৮ স্থানে ২৭১ কেজি পোনা অবমুক্ত

আত্রাই বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় মাছ ফিরিয়ে আনতে ৮ স্থানে ২৭১ কেজি পোনা অবমুক্ত

সেনাবাহিনী-হুথি-সউদী সংঘাতে ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় নিহত ৬৩

সেনাবাহিনী-হুথি-সউদী সংঘাতে ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় নিহত ৬৩

মিশিগানে মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

মিশিগানে মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

বাটেক্সপোতে জাতীয় ঐকমত্যের ঐতিহ্য ধরে রাখার আহ্বান মিয়া গোলাম পরওয়ারের

বাটেক্সপোতে জাতীয় ঐকমত্যের ঐতিহ্য ধরে রাখার আহ্বান মিয়া গোলাম পরওয়ারের

কক্সবাজারে পুলিশের অভিযানে ১০ আসামি গ্রেফতার

কক্সবাজারে পুলিশের অভিযানে ১০ আসামি গ্রেফতার

হরমুজে সেনা পাঠাবে না দক্ষিণ কোরিয়া

হরমুজে সেনা পাঠাবে না দক্ষিণ কোরিয়া

ফরিদপুরে নিজ জমির গাছ কাটতেও লাগবে বন বিভাগের অনুমতি

ফরিদপুরে নিজ জমির গাছ কাটতেও লাগবে বন বিভাগের অনুমতি

ভূমি সেবায় ১ শতাংশ দুর্নীতিও বরদাশত নয়: ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

ভূমি সেবায় ১ শতাংশ দুর্নীতিও বরদাশত নয়: ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের আগেই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের

ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের আগেই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের

অভিষেকের দ্রুততম সেঞ্চুরিতে হোয়াইটওয়াশড আফগানিস্তান

অভিষেকের দ্রুততম সেঞ্চুরিতে হোয়াইটওয়াশড আফগানিস্তান

বিশ্ববাজারে আবারও কমলো জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্ববাজারে আবারও কমলো জ্বালানি তেলের দাম

নগরকান্দায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রকল্প লুটের অভিযোগ

নগরকান্দায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রকল্প লুটের অভিযোগ

উপনির্বাচন ঘিরে ফের প্রকাশ্যে তৃণমূল-কংগ্রেসের দূরত্ব

উপনির্বাচন ঘিরে ফের প্রকাশ্যে তৃণমূল-কংগ্রেসের দূরত্ব

নাইজেরিয়ায় বিষাক্ত মদপানে ৪৯ জনের মৃত্যু

নাইজেরিয়ায় বিষাক্ত মদপানে ৪৯ জনের মৃত্যু

রংপুরের ১২ এলাকায় আজ ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ

রংপুরের ১২ এলাকায় আজ ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ

জ্বালানি সংকটে গাজার হাসপাতালে অধিকাংশ সেবা বন্ধ

জ্বালানি সংকটে গাজার হাসপাতালে অধিকাংশ সেবা বন্ধ

কোটি টাকার গয়না লুট, ক্ষতিপূরণে কিম পেলেন মাত্র ১৪২ টাকা!

কোটি টাকার গয়না লুট, ক্ষতিপূরণে কিম পেলেন মাত্র ১৪২ টাকা!

এনবিআরের ১৯১ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে বদলি-পদায়ন

এনবিআরের ১৯১ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে বদলি-পদায়ন